২২ হাজার কোটি টাকার জন্য সিগারেট বন্ধ করা যায় না!

0
54

কাগজ প্রতিবেদক: তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর সরকারকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দিচ্ছে। বাজেট প্রণয়নের সময় এই বিপুল অঙ্কের রাজস্বের কারণে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য বন্ধ করা যায় না।

কথাগুলো বলেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তবে তিনি এও বলেছেন, পরোক্ষভাবে ওই রাজস্বের চেয়েও বেশি খরচ হচ্ছে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত লোকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য।

আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অডিটরিয়ামে তামাকবিরোধী জাতীয় প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে ‘সেমিনার ও তামাক নিয়ন্ত্রণ পদক-২০১৯’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে সাধারণ কৃষিকে যদি লাভজনক করা যায়, তবে কৃষকরা তামাক চাষে নিরুৎসাহিত হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য তো রাজস্ব দরকার। এই ২২ হাজার কোটি টাকা সরকার কিভাবে পাবে? এ জন্য আপনারা, উদ্যোক্তারা যখন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন তাঁরা উপলব্ধি করেন বা তাঁদেরও উপলব্ধি আছে যে সিগারেট বন্ধ করা দরকার। কিন্তু যখন বাজেট করতে যায় তখন ওই ২২ হাজার কোটি টাকা নানাভাবে পেছনে টানে। এই হলো মূল সমস্যা। এত বড় অঙ্কের রাজস্ব যারা দেয় চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

তবে এর উপায়ও বলে দিয়েছেন ড. আবদুর রাজ্জাক। বলেন, শুধু যারা ঢাকায় বসবাস করেন, তারাও যদি সঠিকভাবে তাদের ট্যাক্স দেন তাহলে তামাক কোম্পানির এই ট্যাক্স পরিহার করা সহজ হবে এবং তামাক উৎপাদনও বন্ধ করা যাবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষির আধুনিকায়ন, যান্ত্রিকীকরণ এবং রপ্তানির বাজার অপরিহার্য। সামগ্রিক অর্থে কৃষির আধুনিকায়নই তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করবে চাষিদের।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ২০৪০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে তামাক শতভাগ নির্মূল। কৃষিকে সত্যিকার অর্থে বাণ্যিজ্যিক কৃষি, আধুনিক কৃষি করা গেলে ২০৪০ সালের আগেই তামাকমুক্ত সমাজ গড়া যাবে। এরই মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।

অনুষ্ঠানে উপস্থাপনায় দেখানো হয়, বিশ্বের তামাক উৎপাদনকারী ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম, প্রথমে আছে চীন। বাংলাদেশের মধ্যে তামাক উৎপাদনকারী জেলার মধ্যে প্রথম হচ্ছে কুষ্টিয়া জেলা। তামাক চাষের নিবিরতা ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২১৩ শতাংশ হয়েছে। এতে আরো দেখানো হয় যে সামগ্রিকভাবে তামাক চাষের চেয়ে সবজি চাষ লাভজনক। তামাক উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেঙে কৃষি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট তামাক ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ৭৮ লোখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর (১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব) ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার অনেক বেশি। তামাক ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নিট ক্ষতির পরিমাণ ওই সময় অনুযায়ী দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর সিগারেট কেনায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ও বিড়ি কেনায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে। শুধু ধূমপানের কারণেই আয়ুষ্কাল কমে যায় ১০ থেকে ২০ বছর। বিশ্বে যত লোক মারা যায়, তার দ্বিতীয় প্রধান কারণ ধূমপান।

অনুষ্ঠানে তামাকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকার জন্য প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি উদ্যোগ, গবেষণা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ পদক দেওয়া হয় মোট চারজনকে। সম্মাননা প্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসক অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত।

পিকেএসএফের সভাপতি ড. খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল মালেক।