আমার গ্রাম হবে আমার শহর

0
77

মো.ওসমান গনি: আবহমান গ্রামবাংলার ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগুলো আর বুঝি গ্রাম থাকছে না। সেখানেও অনিবার্যত লাগবে একেবারে অত্যাধুনিক নগরায়ণ না হোক, অন্তত শহরাঞ্চলের ছোঁয়া। নির্বাচিত সরকারের এটি অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ শীর্ষক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক শহরের সুযোগ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বিনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর জন্য সময় লাগতে পারে অনধিক দুই বছর। উল্লেখ্য, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে গ্রামবাংলায় কৃষি বিপ্লব, বিদ্যুত ব্যবস্থা, কুটির শিল্পসহ আনুষঙ্গিক শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, যোগাযোগ, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন। তার সেই বহু দূরদর্শী স্বপ্ন অতঃপর বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে। গ্রামকে শহর বানানো মানে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য শহরের মতো ঘিঞ্জি ঘনবসতিপূর্ণ যানজট, জনজট, জলাবদ্ধতা, পুঁতিগন্ধময় আবর্জনা ও অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশনের কোন বেহিসেবি আস্তানা বা আবাসন নয়। বরং যথার্থ গ্রাম ও গ্রামের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক শহরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো পৌঁছে দেয়া। গত দশ বছরে সরকারের ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম হলো ঘরে ঘরে বিদ্যুত। মূলত বিদ্যুতের সঙ্গে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বিষয়টি ওতপ্রোত জড়িত। বিদ্যুত গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। ছোট বড় শিল্পের বিকাশ হয়। মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ে। এর সঙ্গে বেড়ে যায় শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও হাটবাজারসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন। গ্রাম-গঞ্জে এখন ব্যাংকিং সুবিধাসহ কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগও সহজলভ্য। মোবাইল ফোন তো আছেই। মোটকথা বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। সুতরাং গ্রাম আর কতকাল গ্রাম থাকবে- এই প্রশ্ন উঠবেই। আর সেজন্যই সরকার ঘোষিত গ্রামোন্নয়ন, সময় ও চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য। গত কয়েক বছরে ব্যাপক আর্থিক উন্নয়নের ফলে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে উপজেলা সদরসহ অনেক গ্রাম-গঞ্জ ও ইউনিয়নের। পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়ের ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষের আয়-উপার্জন বেড়েছে বহুলাংশে। প্রায় গ্রামেরই এক বা একাধিক ব্যক্তি প্রবাসে থেকে আয়- উপার্জন করে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে থাকে দেশে ও গ্রামের বাড়িতে। সেখানেও খুব দ্রুতই গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি, বিলাসবহুল কটেজ এমনকি ক্ষুদ্রশিল্পসহ কল-কারখানা। স্বীকার করতে হবে যে, এসবই উন্নয়নের শুভ লক্ষণ। তবে প্রায় সবই পরিকল্পনাবিহীন ও শ্রীহীন। যেমন চারদিকে কৃষিক্ষেত অথবা জলাভূমি, মাঝখানে একটি চার-পাঁচতলা সুদৃশ্য ইমারত। এটিকে কি আমরা আদৌ উন্নয়ন বলব? নিশ্চয়ই নয়। এর জন্যই আজকাল নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও বাস্তুসংস্থানবিদরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন, সুষ্ঠু ও

সমন্বিত পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ওপর। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার যে অবস্থা, অথবা চট্টগ্রাম ও বিভাগীয় নগরগুলোর তাতে করে আধুনিক ডিজিটাল নগর তথা আবাসন গড়ে তোলার সম্ভব নয়। কেননা, এসবই এখন পর্যন্ত গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। পরিকল্পনাবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের ৩০ শতাংশ লোক বসবাস করে শহরে। ২০৪০ সাল নাগাদ জনসংখ্যার অর্ধেক লোক বসবাস করবে শহরে। অতঃপর বিদ্যমান শহরগুলোর পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন করতে গেলে লোকজন সরাতে হবে। ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে হবে সবকিছু। বাস্তবে তা কখনোই সম্ভব নয়। সেজন্য এখন চোখ ফেরানোর সময় এসেছে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে। প্রতিটি উপজেলায় গড়ে তুলতে হবে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ। কেননা সেখানেও ভাল করেই লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। সে অবস্থায় যত্রতত্র আবাসন, যত্রতত্র স্থাপনা ও কলকারখানা না করে স্থানীয় জনসংখ্যা ও চাহিদার প্রেক্ষাপটে নিতে হবে সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত উন্নয়ন। আর তাহলেই কেবল সম্ভব একটি আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ। আবহমান গ্রামবাংলায় চিরায়ত সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক আবেদনকে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখেই গ্রহণ করতে হবে গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনা।

মো.ওসমান গনি

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট