আর্থিক খাত সংস্কারে পদক্ষেপ জরুরি: ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

0
46
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

আজকের কাগজ: দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা সন্তোষজনক। তবে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ভারসাম্য বজায় থাকছে না। এর মধ্যে আর্থিক খাতের অবস্থা বেশ নাজুক। এক্ষেত্রে মুদ্রা ও পুঁজিবাজার- দুটিই বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। না হলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।

বেসরকারি খাতের নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিস্থিতি বেশ হতাশাজনক। এ দুটি খাতে সরকারকে নজর দিতে হবে। আগামী বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো। তবে এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে শতভাগ স্বাধীনতা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই স্বাধীনতা শক্তভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে শক্ত পদক্ষেপ নিতে গেলে নানা দিক থেকে চাপ আসতেই পারে। সেগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। যারা চাপ দেয়, তাদেরও বোঝাতে হবে এ খাতটি ঠিকমতো না চললে সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সব খাতে সুফল পেতে হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আর্থিক খাতকে।

আজকের কাগজ : বাজেট বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ থাকছে?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : সরকারের সবচেয়ে দুর্বল দিক হল বাজেট বাস্তবায়ন করতে না পারা। প্রতি বছরই বাজেটের আকার বাড়ছে। বড় বড় প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে বছর শেষে বাজেট কাটছাঁট করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হওয়ায় অন্যান্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেমন ধরুন, সরকার বাজেটে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করল, সে আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করল। সরকারকে ঋণের জোগান দিতে ট্রেজারি বিলের নিলামে সিডিউল নির্ধারণ করল। কিন্তু সে সূচি অনুযায়ী সরকার ঋণ নিল না। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিডিউল ব্যর্থ হল বা সফল করলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সরকারের হিসাবে রাখতে হবে। এতে সরকারের ব্যয় বাড়বে, কিন্তু ঋণের টাকা খরচ করতে পারবে না। ফলে টাকার চলাচল বাধাগ্রস্ত হল। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিও স্তিমিত হল। এ বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে।

এডিপিতে যেসব প্রকল্প নেয়া হয়, সেগুলোর বাস্তবায়নের গুণগত মান বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিুমানের। এগুলোয় অর্থ বরাদ্দ থাকলেও খরচ হয় না। ফলে অর্থ ফেরত চলে যায়। এ অবস্থায় সরকারের উচিত বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করা। প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান ঠিক রাখতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আজকের কাগজ : এবারের বাজেটে মূল চ্যালেঞ্জ কী?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : রাজস্ব আয় বাড়ানো এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছরই খরচ বাড়ছে। কিন্তু সে হারে আয় বাড়ছে না। এতে থেকে যাচ্ছে রাজস্ব ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণে নিতে হচ্ছে উচ্চ সুদে ঋণ, যা সরকারের সুদের বোঝাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যয়ের সঙ্গে মিল রেখে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বাজেটে করের আওতা বাড়ানো হবে। কিন্তু আওতা বাড়িয়ে কর আদায় বৃদ্ধি করার মতো সক্ষমতাও থাকতে হবে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নের পরই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি জোর দিতে হবে। বড় প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি অর্থায়নে বেশি নজর দিতে হবে। তা না হলে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হবে না। এসব খাতেই দ্রুত এবং সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়।

এতদিন বড় বড় বাজেট দেয়া হয়েছে। এবারও বড় বাজেট দেয়া হলে তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেটি যেন বাস্তবায়নযোগ্য হয়। রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি ব্যয়ের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তবের বিপুল ফারাক। কর আদায় বাড়াতে হলে করহার যৌক্তিক করতে হবে। জোর করে ভ্যাট আর আয়কর চাপিয়ে দিয়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উন্নতি হবে না। এক্ষেত্রে মানুষের সামর্থ্য আছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। একই সঙ্গে কর আদায়ের ক্ষেত্রে সমতার নীতি নিশ্চিত করতে হবে। যার সামর্থ্য আছে কর দেবেন, যার সামর্থ্য নেই তিনি ছাড় পাবেন।

এবারের বাজেটেও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত- কর আদায়ের প্রভাবটাও যেন নেতিবাচক না হয়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট যুক্তিসঙ্গত করতে হবে, যাতে বাস্তবায়ন হয়। তৃতীয়, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন যাতে হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। চতুর্থ, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখলে চলবে না, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থান এগুলোয় বিশেষ নজর দিতে হবে। সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নে জোর দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে সব খাতে সুশাসনের দিকে। সুশাসন না হলে কোনো খাতই বেশিদূর এগোতে পারে না। কোরিয়ার মতো দেশ শিক্ষা খাতে জিডিপির ১২ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। আমরা দিই ২-৩ শতাংশ। এ দুই খাতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পঞ্চম, শিল্প খাতে নীতিবৈষম্য দূর করতে হবে। রফতানি বৈচিত্র্যের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রণোদনা এখনও বেশি দেয়া হচ্ছে কেবল পোশাক খাতে। এক্ষেত্রে সমতা আনতে হবে।

আজকের কাগজ : বাজেটে দুর্বল দিকগুলো কী?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : দুর্বলতার মধ্যে অন্যতম হল যথাসময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া। নিখুঁতভাবে প্রকল্প মনিটরিংয়ের অভাব। এতে প্রকল্প ব্যয়ের খরচ বেড়ে যায়। প্রতি বছরই এডিপির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তা সংশোধিত বাজেটে কমে আসে। এরপরও বাস্তবায়ন অর্থাৎ দুই দফা সংশোধন করা হয়। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া, যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো হল বাজেটে সরকারের দুর্বল দিক।

আজকের কাগজ : কোন খাতে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ দেশে কর্মপ্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু মানুষগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে নিয়ে আসার জন্য যে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ দরকার, তা পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। সাধারণ শিক্ষার প্রসার হলেও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে কীভাবে কর্মমুখী করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। দেশের সব মানুষ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। সেজন্য এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে তুলতে হবে।

আজকের কাগজ : আয় বাড়াতে আপনার সুপারিশ কী?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : প্রত্যক্ষ করে (ডাইরেক্ট ট্যাক্স) অর্থাৎ যেটি বলা হয় আয়কর, সেই খাতে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ থাকতে হবে। কেননা বিশ্বের সব দেশের বাজেটই প্রণয়ন করা হয় ব্যক্তি করের ওপর জোর দিয়ে। কিন্তু আমাদের এখানে জোর কম থাকে। করের আওতা বাড়ানো এবং সবার কাছ থেকে যথাযথভাবে কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে এ খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি কর আদায় করা সম্ভব। এবার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে ভ্যাটের ওপর জোর দেয়ার। নিশ্চয়ই ভ্যাটের প্রয়োজন আছে। কিন্তু পরোক্ষভাবে ভ্যাট ট্রান্সফার হয়ে যায়। ভ্যাট আদায় হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। ফলে গ্রাহক ভ্যাটের যেসব অর্থ সরকারকে দেয়, সেগুলোর সব সরকারের হিসাবে জমা হয় না। এতে সরকারের রাজস্ব আয় কম হয়। পরের বছর আবার করের হার বা আওতা অন্য খাতে বাড়ানো হয়। ফলে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

পৃথিবীর সব দেশেই প্রত্যক্ষ করে বা আয়করে বেশি নজর দেয়া হয়, পরোক্ষ করে (ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক) নয়। আমাদের এখানে কর্পোরেট কর অনেক বেশি। সেটি যৌক্তিক করা দরকার। এতে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর চাপ কমবে। এক্ষেত্রে করহার না বাড়িয়ে করজাল বাড়াতে হবে। এখন সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তির টিআইএন নম্বর আছে। সেখানে মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানা আছে। তাহলে কেন কর দিচ্ছেন না, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। সার্ভে করতে হবে। সেটি করতে না পারলে এনবিআরের কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে না। আমাদের দেশে কর সংগ্রহ এখনও বড় বড় শহরকেন্দ্রিক। মফস্বল থেকে খুব একটা কর আসে না। সেখানে অনেক ধনী লোক ও ব্যবসায়ী আছেন। তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় কর আসে না। মোট কথা, কেবল ভ্যাটের ওপর নির্ভর না করে আয়করের আওতা বাড়াতে হবে।

আজকের কাগজ : ব্যাংকিং খাত নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রচলিত আইনকানুন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা ফেরত দেয় না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। দু-একটি ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে অন্যরা দুর্নীতি করতে ভয় পাবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের কাগজ : বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কী ধরনের সুবিধা থাকা উচিত?

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য আগে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে ক্ষুদ্র-মাঝারি বিনিয়োগকারীদের অন্যভাবে সহায়তা করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা, মার্জিন লোন বিবেচনায় নিতে পারে।