লক্ষ্মীপুরে জেলেদের মাঝে নেই ঈদ আনন্দ

0
15
লক্ষ্মীপুরে জেলেদের মাঝে নেই ঈদ আনন্দ

তাবারক হোসেন আজাদ: প্রায় ২ লাখ টিয়া চালান খাটাইয়ে নতুন নৌকা বানাইছি। নতুন করে নদীত যামু, বড় বড় ইলিশ ধরিয়াম, কপাল হিরব, হোলাহাইন নিয়া ঈদ করিয়াম। কিন্তু হেডা অইলো না। ৯ জন জাইল্লা লই নদীত গেছি। বে¹ুনরে আগেই টিয়া দি আইনতে অইছে। কিন্তু যেরুম চালান খাটাইছি, হেরুম ইলিশ হাই নাই। অন আঙ্গ পকেট খালি, কেমতে ঈদ করিয়াম ? ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষায় ইলিশ শিকার বন্ধ থাকার পর গত দুই মাস পার হলেও নদীতে কাঙ্খিত পরিমাণ ইলিশের আশা পূরণ না হওয়ায় এভাবেই হতাশা ব্যক্ত করেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর জেলে আবুল খায়ের মাঝি। বয়সটা চল্লিশ গিয়ে ঠেকেছে। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা চরবংশী গ্রামে মেঘনার পাড়ে তার বাড়ি। মেঘনায় ইলিশ ধরেন তিনি। চরবংশীর ফাঁড়ি থানা সংলগ্ন ইলিশ ঘাটের পাশে মেঘনার কূলে বসেই কথা হচ্ছিলো তার সঙ্গে। তিনি আরো বলেন, ‘বড় আশা বুক পেতে নদিতে গিয়েছি। কিন্তু যেমন আশা করেছি, তার ধারে-কাছে যাওয়ার চিন্তা করতে পারিনি। দুই দিনের খরচ ৫ হাজার টাকা। ইলিশ পাইছি ৩ হালি। বিক্রি করেছি ৯ হাজার টাকা। যদি একদম স্বাভাবিকভাবে ইলিশ থাকতো তাহলে নিচে হলেও ৩০ হাজার টাকা রোজগার হইতো। অভিযানের সময় (নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়) নদীতে নামি নাই। আমার জেলে কার্ড আছে। অভিযানের সময় চাল পাইছি। কিন্তু ৪০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও এবার চাল পাইছি ৩০ কেজি। এ চাল দিয়ে কী ২ মাসের সংসার চলে? একই চিত্র লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও হাইমচরের মেঘনায়। নদীতে মিলছে না ইলিশের দেখা। দ্বীপ হাইমচর ও চর ভৈরবী মেঘনা তীর ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। কিন্তু এখানে মেঘনার এপাড়-ওপাড় ঘুরে ইলিশের খোঁজ মেলেনি। ইলিশের আকাল চিত্রের দেখা মেলে হাইমচরের ভৈরবী মাছঘাটে গিয়ে। আড়ৎ ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, অভিযানের সময়েও চুপচাপে ইলিশ শিকার হয়েছে। তাই নদীতে ইলিশ নেই। একজনের দেখাদেখি অন্যরাও ইলিশ শিকারে উৎসাহ পেয়েছে। মেঘনায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরার সঙ্গে মেঘনাপাড়ের বহু মানুষের জীবন-জীবিকার স্রোত বয়ে চলে। এ সখ্যতায় বিবর্ণ রূপ দেখা দেয় নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে অথবা ইলিশের দেখা না মিললে। মেঘনার জেলে ও মেঘনাপাড়ের মৎস্য ব্যবসায়ী, বরফ কারখানার মালিক-শ্রমিক, স্থানীয় দোকানপাটের ব্যবসায়ীদের জীবিকা কেবল নদীর ওপরই নির্ভর। মোঃ ছৈয়দ মিয়া। বয়স ৩২ বছর। স্ত্রী ও ২ ছেলে নিয়ে তার সংসার। মেঘনাপাড়েই চায়ের দোকান। এতেই জীবন বাঁচে। তিনি বলছিলেন, ‘নদীর জেলেদের আয় থাকলে আমাদের আয়। কারণ নদীতে গিয়ে তারা যদি মাছ না পায়, তাহলে দোকানের বেচাকেনাও বন্ধ। আর বেচাকেনা না হলে আমাদের আয়-রোজগারও হবে না। এতে আমরাও ইচ্ছে করলে ঈদে আনন্দ-ফুর্তি করতে পারি না। এজন্য আমরাও বলতে গেলে নদীতে মাছ পাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। তা ছাড়া জেলেদের বাকি দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও সম্ভব না।’ পূর্ব চর রমণী মোহনের আরেক জেলে হাফিজ উদ্দিন। তার বয়স এখন ৩৮ বছর। কার্ড থাকলেও চাল বিতরণ নিয়ে অভিযোগের তীর ছোড়েন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘৪০ কেজি চাইলের জায়গায় আমাকে ২৮ কেজি চাল দিয়েছে। যারা নদী চিনে না, কখনো নদীতে মাছ ধরতে যায় নাই, তারা জেলের কার্ড পেয়েছে।’ লক্ষ্মীপুর জেলার মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি মোস্তফা বেপারী বলেন, ‘১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস নদীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশ ব্যবসা তেমন লাভজনক হয়ে ওঠেনি। তবে জেলেরা আশা করেছিল অভিযান শেষ হলে হয়তো ইলিশ পাওয়া যাবে। কিন্তু অভিযান শেষ হয়ে দুই মাস পার হতে চললেও নদীতে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা না পড়ায় সবার মাঝে হতাশা নেমে এসেছে। তাছাড়া অভিযান চলাকালীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত কার্ডের সংখ্যা এ অঞ্চলে কম। যার জন্য এখানের বহু জেলেই অভিযানের সময় মানবেতর জীবন পার করে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ঈদ উপলক্ষে জেলে ও নদীতে জীবিকা নির্ভর মানুষের জন্য কোনো বরাদ্দও নেই। নদীতে গিয়ে ইলিশ না পেলে ঈদের আনন্দ মাটিতে মিশে যায়।’

এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘এ সময়ে নদীতে একটু ইলিশ কম থাকে। যা ইলিশ তা চাঁদপুর হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম চলে যায়। ছোট মাছগুলো গ্রামের বাজারগুলোতে পাওয়া যায়। জেলেদের কাঙ্খিত আশা পূরণ হয় নি।’ ঈদকেন্দ্রিক জেলে সম্প্রদায়ের জন্য কোনো বাজেট আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযান চলাকালে কিছু বরাদ্দ আসে। তবে সেটা অতটা না, যে সকল জেলে পাবে। আর ঈদ উপলক্ষে জেলেদের জন্য কোনো বাজেট নেই।’ উল্লেখ্য- লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ৫০ হাজার ২’শ ৫২ জেলে পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদরে- ৭ হাজার ৫১৮, রায়পুরে ৭ হাজার ৫৫০, রামগতিতে ২০ হাজার ৩৬০ ও কমলনগর উপজেলায় ১৪ হাজার ১০০ কার্ড ধারী জেলে পরিবার রয়েছে।