ছেলেধরা সন্দেহে এনজিওকর্মী-ছাত্রসহ ২১ জনকে গণপিটুনি

0
62
ছেলেধরা সন্দেহে এনজিওকর্মী-ছাত্রসহ ২১ জনকে গণপিটুনি

কাগজ ডেস্ক: ছেলেধরা সন্দেহে সাত জেলায় ২১ জন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মানসিক ভারসাম্যহীন, এনজিওকর্মী, অজ্ঞান পার্টির সদস্য, কলেজছাত্র ও সাধারণ লোকজন।
রোববার ও সোমবার চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ঢাকার সাভার, রাজশাহী ও নীলফামারীতে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ছেলেধরা সন্দেহে তিনজন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন।
ওই তিনজন ছাগল কিনতে সোমবার দুপুরে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আহতরা হলেন- জনি, সোহেল ও হৃদয়। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে।
বাঁশখালী থানার রামদাস মুন্সীর হাট তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মামুন হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, “দুপুরে এ তিন যুবক ইলশা গ্রামে ছাগল কিনতে যায়। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদের ছেলেধরা সন্দেহে মারধর করে। খবর পেয়ে আমরা ঘটনান্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।”
আহতরা ছাগল কিনতে ইলশা গ্রামে গিয়েছিল বলে পুলিশ জানালেও তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানাতে পারেনি।
কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে পিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা।
দৌলতপুর থানার ওসি আজম খান জানান, উপজেলার শিতলাইপাড়া গ্রামে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
আহত হাসিনা খাতুন (৬০) বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। তাকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
ওই নারীর মেয়ের জামাই রনি বলেন, তার শ্বাশুড়ি মানসিক ভারসাম্যহীন। গত রোজার ঈদের আগে শ্বাশুড়ি তার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।
“তিনি বাড়ি থেকে বের হলে রাস্তা-ঘাট ঠিক চিনতে পারে না। আজ সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাইরে এসে পথ ভুলে যায়। এরপর স্থানীয়রা ছেলে ধরা সন্দেহে তাকে মারধর করেছে।”
সাভার
ঢাকার সাভারে ছেলেধরা সন্দেহে ভাড়াটিয়া দম্পত্তিকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আটক করে।
আটককৃতরা হলেন রনি মিয়া (২৩) ও তার স্ত্রী (২০)। তাদের বাড়ি রাজবাড়ি জেলার গোদাগাড়ী থানার সাহেব বাজার গ্রামে। তারা সাভার পৌর এলাকার রাজাবাড়ি মহল্লার আমিনুর রহমানের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সোমবার দুপুরে সাভার পৌর এলাকার রাজাবাড়ি মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে সাভার মডেল থানার এসআই নাজমুল হক বলেন, ছেলেধরা সন্দেহে রাজাবাড়ি মহল্লার বাসিন্দারা এক দম্পত্তিকে মারধর করে রশি দিয়ে বেঁধে রেখে পুলিশে খবর দেয়।
পরে আহত অবস্থায় ওই দম্পত্তিকে উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আটক করা হয়।
তিনি বলেন, আটক দম্পতি দুপুরে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া রুমি খাতুনের ঘরে ঢুকে তার মুখ চেপে ধরে বলে অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। তখন রুমি চিৎিকার দিলে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
“জিজ্ঞাসাবাদে এই দম্পতি পুলিশকে জানিয়েছে, চলতি মাসেই আমিনুর রহমানের বাড়ির কক্ষটি ভাড়া নিয়েছেন তারা। কিছুদিন ভাড়া থেকে ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে সুসর্ম্পক তৈরি করে তাদের অজ্ঞান করে ঘরের সব মালপত্র নিয়ে চম্পট দেওয়াই তাদের মূল কাজ।”
এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।
রাজশাহী
রাজশাহীর চারঘাটে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন পাঁচ এনজিওকর্মী।
সোমবার দুপুরে উপজেলার রাওথা এলাকা থেকে পুলিশ ওই পাঁচজনকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। আটককৃতরা নিজেদের আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার নামের একটি এনজিওর কর্মী দাবি করেছেন বলে চারঘাট থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন।
ওসি বলেন, চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাওথা এলাকায় অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি সমিতির নাম করে সদস্য সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় সন্দেহ হলে স্থানীয় লোকজন তাদের সমিতির নাম জানতে চেয়ে কাগজপত্র ও পরিচয়পত্র দেখতে চায়। তবে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে ছেলেধরা সন্দেহ পাঁচজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে আটকে রেখে থানায় খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
আটককৃতরা হলেন গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার ঝাকরপুর গ্রামের মসলেম উদ্দিনের ছেলে হাফিজুর রহমান (৪২), একই এলাকার আখতারুজ্জামানের ছেলে আবুল হোসেন (৪০), একই এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে রেজাউল করিম (৩৮), ঢাকা দক্ষিণের লালবাগ থানার আব্দুল মজিদের ছেলে কাইয়ুম আলী (৩৯) ও একই এলাকার আবুল কালাম (৩৬)।
নীলফামারী
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ছেলেধরা সন্দেহে মানষিক ভারসাম্যহীন চারজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় জনতা।
রোববার রাত ও সোমবার দুপুর পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় এসব মানষিক ভারসাম্যহীন নারী-পুরুষ উদ্দেশ্যহীন ও সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাফোরা করায় তাদেও আটক কওে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী।
আটককৃতরা হলেন, দিনাজপুরের আব্দুল মালেক (৫০), গাইবান্ধার আব্দুল গফুর (৫৬), নীলফামারীর হেলাল হোসেন (৪০) ও বরিশালের মেরিয়ান (৪০)।
সৈয়দপুর থানার ওসি মো. শাহজাহান পাশা বলেন, আটককৃতরা সবাই মানষিক ভারসাম্যহীন। তারা সৈয়দপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা করছিলেন। এ সময় তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা সঠিক উত্তর দিতে না পারায় স্থানীয়রা তাদের পিটুনি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে চিকিৎসা দেয়।
তাদের পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
ওসি বলেন, যারা এমন গুজবে সম্পৃক্ত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদারীপুর
মাদারীপুরে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সোমবার সকাল ১১টার দিকে সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বৈরাগীর বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, বৈরাগীর বাজারে সকালে আনুমানিক ৩০/৩৫ বছর বয়সী এক নারীকে ঘুরতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে আকট করে স্থানীয়রা। পরে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করেছে। ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
ভবিষ্যতে যাতে কেউ ছেলেধরা সন্দেহে নির্যাতন করতে না পারে সেই বিষয়ে পুলিশের মনিটরিং জোড়দার আছে বলে জানান তিনি।
বগুড়া
বগুড়ার শেরপুর ও গাবতলীতে ছেলেধরা সন্দেহে পাঁচজনকে পিটিয়ে আহত হয়েছে জনতা।
এরমধে্যে শেরপুর উপজেলায় ‘ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে’ স্নাতকের (সম্মান) এক শিক্ষার্থীকে পিটুনি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
রোববার সন্ধ্যায় উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের শেরুয়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
বাবুল হোসেন (১৮) নামের ওই যুবককে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে থানায় নেওয়া হয়েছে। বাবুল হোসেন একই উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নের পানিসারা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে এবং বগুড়ার একটি কলেজে স্নাতকে লেখাপড়া করেন।
পূর্বশক্রতার জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন গুজব ছড়িয়ে তাকে পিটুনি দেয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
শেরপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বুলবুল ইসলাম বলেন, বাবুল হোসেন তার বন্ধু বাঁধনের শ্বশুরবাড়ি শেরুয়া গ্রামে যান স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মেটাতে।
“কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি তার বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এছাড়া তাদের সঙ্গে বাবুলের পূর্ববিরোধও ছিল।”
তাই তাকে ছেলাধরা হিসেবে গুজব রটিয়ে মারপিট করে বলে পরিদর্শক বুলবুল জানান।
বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে বুলবুল জানান।
অপর ঘটনাটি ঘটে গাবতলীতে সোমবার বিকালে।

সোমবার গাবতলী উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে চারজন যুবককে পিটুনি দিয়ে তাদের ব্যবহৃত একটি পিকআপ ভ্যান পুড়িয়ে দিয়েছে জনতা।
দুর্গাহাটা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করেছে।
তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশও উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করেছে এবং ১৫ জনকে আটক করে।
আহতরা হলেন ধুনট উপজেলার চিকাশি ইউনিয়নের জোড় শিমুল গ্রামের নজির হোসেনের ছেলে নিয়ামুল আকন্দ (৩৬), দুলাল মিয়া (২২), পারধুনটের আব্দুর রশিদের ছেলে লুৎফর রহমান (৩৫) ও গাবতলীর মহিষাবান গ্রামের হযরত আলীর ছেলে ফাহিম (২৪)।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আহতরা ঢাকায় থাকেন। দুজন গার্মেন্টস কর্মী একজন পিকাপ চালক, একজন পিকাপ হেল্পার। এরা গত রাতে তাদের দুজনের বোনের বাসা ধুনটের জোড় শিমুলের উদ্দেশ্যে একটা ওয়ারড্রোব নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা হন।
“সকালে সেটা পৌঁছে দিয়ে ঘুরেফিরে এক বন্ধুর বাসায় আসার জন্য বিকাল ৩টার দিকে দুর্গাহাটায় এলে তাদের সন্দেহজনক আচরণের জন্য পিটুনি শুরু করে জনতা।”
অতিরিক্ত এসপি সনাতন বলেন, খবর পেয়ে গাবতলী থানার এএসআই আউয়াল হাজির হয়ে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও তাদের পার্শ্ববর্তী ইউপি অফিসে ঢুকিয়ে দেন। এ সময় সেখানে কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়ে যায়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে চারজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
১৫ জনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে বলে সনাতন জানান।
গাবতলী মডেল থানার সহকারী পুলিশ সুপার (গাবতলী সার্কেল) সাবিনা ইয়াসমীন বলেন, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। ১৫ জনের মতো সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ আছে। এরমধ্যে যারা জড়িত তাদেরকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। বিষয়টি কঠিন ভাবে দেখা হবে।